চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই পারমানবিক
প্রক্রিয়ায় বিদ্যুত উতপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। যার ধারাবাহিকতায়
১৯৭৭ সালে বর্তমান ইউক্রেইন ও বেলারুশ নামক দেশ দুটোর মধ্যবর্তী সীমান্ত এলাকায়
অবস্থিত চেরনোবিল শহরে একটি পারমানবিক বিদ্যুত উতপাদন কেন্দ্র নির্মান করে সোভিয়েত
সরকার। একে একে সেই কেন্দ্রে চারটি পারমানবিক চুল্লি স্থাপন করা হয়। যার একেকটি
চুল্লি এক হাজার মেগাওয়াট করে বিদ্যুত উতপাদনে সক্ষম। প্রতিষ্ঠার নবম বছর, ১৯৮৬
সালের ২৫ এপ্রিল এই কেন্দ্রের চতুর্থ পারমানবিক চুল্লিটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ
ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। দুর্ভাগ্যবশত শেষ
মুহূর্তের অদল-বদলের কারণে সেই পরীক্ষার দায়িত্ব বর্তায় একেবারে অপ্রস্তুত একদল
প্রকৌশলীর ঘাড়ে। পরীক্ষার পরিকল্পনা অনুযায়ী চতুর্থ চুল্লির মূল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ
ব্যবস্থার বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। কিন্তু ব্যাকআপ জেনারেটর সময় মত
চালু না হওয়ায় কয়েক মিনিটের মধ্যে চুল্লিটি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত এই
তাপের কারণে চুল্লিতে ব্যবহৃত বিপুল পরিমান পানি আচমকা বাষ্পে পরিনত হয়ে আয়তনে
সম্প্রসারিত হয়। এর ফলেই সৃষ্ট প্রথম বিস্ফোরণে চুল্লির ইস্পাত ও কংক্রিট দিয়ে
তৈরী ছাদটা ধসে পড়ে। এরপর দ্বিতীয় আরেকটি বিস্ফোরনে চুল্লিতে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামসহ
বিভিন্ন তেজষ্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ভয়াবহতম
পারমানবিক দুর্ঘটনা, চেরনোবিল বিপর্যয়ের সূচনা এভাবেই হয়েছিল।
১৯৮৬ সালের ২৫ এপ্রিল মধ্যরাতের পর শুরু হওয়া
সেই বিপর্যয়ের পর সোভিয়েত সরকার ক্ষতিগ্রস্থ চুল্লিটিকে কেন্দ্র করে ত্রিশ
কিলোমিটার ব্যাসার্ধবিশিষ্ট একটি বৃত্তাকার এলাকা ঘিরে ফেলে। প্রাথমিক সেই
এক্সক্লুশন জোনের আওতাধীন ছিল দু হাজার ছয়শো চৌত্রিশ বর্গকিলোমিটার এলাকা।
পরবর্তীতে এই জোনের আওতা বাড়িয়ে চার হাজার একশো তেতাল্লিশ বর্গকিলোমিটার করা হয়।
ততকালীন সোভিয়েত সরকার এই দুর্ঘটনা নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করলেও,
পরবর্তী সময়ে চালানো তদন্ত অনুযায়ী, চেরনোবিল বিপর্যয়ের ফলে বিদ্যুত উতপাদন
কেন্দ্রটির চতুর্থ চুল্লিতে ব্যবহৃত ১৯০ টন ইউরেনিয়ামের অন্তত ত্রিশ শতাংশই
বায়ূমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আতকে ওঠার মত বিষয় হচ্ছে, বিজ্ঞানীদের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র
এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন এই দেশদুটো পারমানবিক বোমা
পরীক্ষার নামে পৃথিবীর বায়ূমণ্ডলে যে পরিমান তেজষ্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়েছে, চেরনোবিল
বিপর্যয়ে তার মাত্র একশো ভাগের এক ভাগ তেজষ্ক্রিয় পদার্থ বায়ূমণ্ডলে নির্গত
হয়েছিল।
পারমানবিক চুল্লি আর বোমা প্রায় একই প্রক্রিয়ায়
কাজ করে। তফাত হচ্ছে, চুল্লিতে চেইন রিঅ্যাকশনটা নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় হয় আর
পারমানবিক বোমার ক্ষেত্রে চেইন রিঅ্যাকশনে কোন নিয়ন্ত্রণ রাখা হয় না। চেরনোবিল
বিদ্যুত কেন্দ্রে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ায় চুল্লির চেইন রিঅ্যাকশন
অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীদের হিসেবে এই অনিয়ন্ত্রত চেইন রিঅ্যাকশনের কারণে
বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া তেজষ্ক্রিয় পদার্থের পরিমান হিরোশিমায় পারমানবিক বোমা
বিস্ফোরনের চারশ গুন বেশী ছিল। তাছাড়া আবহাওয়ার কারণে সেই তেজষ্ক্রিয় কনাগুলো অনেক
দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল। তাই চেরনোবিল বিপর্যয়ে প্রত্যক্ষ প্রাণহানির ঘটনা
হিরোশিমার তুলনায় কম হলেও পরোক্ষ ক্ষতির শিকার হয়েছেন অনেক বেশী সংখ্যক মানুষ।
নিজেদের গাফিলতির কারণে ঘটা এই দুর্ঘটনার
বিষয়টি প্রাথমিক অবস্থায় গোপন রাখে সোভিয়েত সরকার। ইউরোপে কোন বিপর্যয় ঘটে থাকতে পারে
এই আভাস বিশ্ববাসী প্রথম পেয়েছিল সুইডেন সরকারের পক্ষ থেকে। ২৮ এপ্রিল সকালে
দেশটির ফর্সমার্ক পারমানবিক বিদ্যুত উতপাদন কেন্দ্রের সেন্সরে অতিরিক্ত
তেজষ্কিয়তার সন্ধান পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে এ কেন্দ্রের কর্মীদের কাপড়ে তেজষ্ক্রিয়
কনার অস্তিত্ব খুজে পান তদন্তকারী কর্মকর্তারা। কিন্তু নিজ বিদ্যুত উতপাদন
কেন্দ্রে কোন ত্রুটি না থাকায় সুইডেন সরকার প্রতিবেশী সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর এই
তেজষ্ক্রিয়তার উত্স জানতে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। যার ধারাবাহিকতায় ক্রেমলিন
বিষয়টি স্বীকার করে। সুইডেনের সেই বিদ্যুত কেন্দ্রটি চেরনোবিল শহর থেকে ১১০০
কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অর্থাত তেজষ্ক্রিয় কনাগুলো বাতাসে মাত্র ৩৬ ঘন্টায় ঐ
দূরত্ব অতিক্রম করে। প্রায় একই সময় ফিনল্যান্ড সরকারও তাদের বাতাসে ক্ষতিকর
তেজষ্ক্রিয় কনা শনাক্ত করে। কিন্তু তখন দেশটিতে সরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন দাবীদাওয়া
নিয়ে কর্মবিরতি চলায় সুইডেনই প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীকে চেরনোবিল বিপর্যয় নিয়ে
সতর্ক করেছিল।
চেরনোবিল বিপর্যয়ের কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমান
ছিল প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি ডলার। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় আবাদী জমির। ইউরোপের
একাধিক দেশজুড়ে বিস্তৃত বিস্তীর্ন এলাকার আবাদী জমি তেজষ্ক্রিয়তার কারণে চাষাবাদের
অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ইউরোপের মোট তেরটি দেশ এই ক্ষতির শিকার হয়। এর মধ্যে রাশিয়ার
প্রায় ৫৮ হাজার বর্গকিলোমিটার, ইউক্রেইনের ৪২ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং
বেলারুশের প্রায় ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে যায়। বিশেষ
করে বেলারুশের সীমান্তবর্তী শতকরা ২২ ভাগের বেশী জমি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া এই ক্ষতির শিকার হওয়া অন্য দেশগুলো হচ্ছে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া,
নরওয়ে, বুলগেরিয়া, সুইজারল্যান্ড, গ্রিস, স্লোভেনিয়া, ইতালি এবং মলদোভা।
চেরনোবিল বিপর্যয়ে সরাসরি মৃত্যু হয় তিন জনের।
এই তিন জনই চুল্লির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার সাথে জড়িত ছিলেন। বিপর্যয়ের কয়েখ
দিনের মধ্যে তেজষ্ক্রিঁয়তার শিকার হয়ে প্রাণ হারায় আরো ২৫ জন। সব মিলিয়ে আহত
হয়েছিল শতাধিক মানুষ। তবে এই বিপর্যয়ের পরোক্ষ ক্ষতির পরিমান অনেক বেশী ছিল।
জাতিসংঘের তদন্ত অনুযায়ী এর ফলে কমপক্ষে ৬ হাজার শিশু থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত
হয়। এছাড়া আরো নয় হাজার মানুষ পরবর্তীতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুকিতে পড়েন।
বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী এই তেজষ্ক্রিয়তার ক্ষতি কয়েক প্রজন্ম পরেও দেখা দিতে
পারে। যার কারণে জন্ম নেয়া শিশুরা মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হতে পারে।
চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর ইউরোপসহ সারাবিশ্বের
সভ্য দেশগুলোয় পারমানবিক চুল্লির সাহায্যে বিদ্যুত উতপাদনের বিরুদ্ধে জনসাধারণ
সোচ্চার হয়ে ওঠেন। জনগনের এই প্রতিবাদের মুখে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং
যুক্তরাজ্যের মত দেশগুলো তাদের বিদ্যুত উতপাদন নীতিতে বড় পরিবর্তনও আনে। কিন্তু এই
বিপর্যয়ের মূল হোতা সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমানবিক চুল্লির ব্যবহার অব্যাহত রাখে। এমনকি
খোদ চেরনোবিলের বাকি তিনটি চুল্লি ঐ বিপর্যয়ের পরেও বহু বছর সক্রিয় ছিল। ১৯৯১ সালে
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় আরো একটি চুল্লি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ততদিনে
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে একাধিক দেশে ভাগ হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৬ সালে আরেকটি চুল্লির
ব্যবহার বন্ধ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে সর্বশেষ চুল্লিটি বন্ধের মধ্য দিয়ে
চেরনোবিল বিদ্যুত উতপাদন কেন্দ্রের কার্যক্রমে ইতি টানে কর্তৃপক্ষ।
এই চেরনোবিল বিদ্যুত উতপাদন কেন্দ্রের কর্মীদের
বসবাসের জন্য ১৯৭০ সালের চৌঠা ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রের কাছেই নতুন একটি শহরের
গোড়াপত্তন করে সোভিয়েত সরকার। বর্তমানে ইউক্রেইন-বেলারুশ সীমান্ত এলাকায় প্রিপিয়াত
নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরের নামও রাখা হয় প্রিপিয়াত। আনুষ্ঠানিকভাবে এই শহরটি সিটি
কর্পোরেশনের মর্যাদা পায় ১৯৭৯ সালে। ঐ সময় শহরটির মোট বসবাসযোগ্য এলাকার পরিমান
ছিল ৭০ লাখ বর্গফুটের বেশী। যেখানে সরকার নির্মিত ১৬০টি বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট
ব্লকে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন চল্লিশ হাজারের বেশী মানুষ। যাদের
বিনোদনের জন্য একটি সুপ্রশস্ত উদ্যানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০ হাজার গাছ রোপন
করা হয়েছিল। সৌন্দর্য্যবর্ধনে শহরের বিভিন্ন স্থানে ছিল ৩৩ হাজার গোলাপ গাছও।
খেলাধূলার জন্য শহরজুড়ে ৩৫টি মাঠ আর বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য চালু করা হয় ১৫টি
প্রাথমিক বিদ্যালয়। শহরের বাসিন্দাদের জন্য চার শতাধিক শয্যাবিশিষ্ট একটি
হাসপাতালও নির্মান করা হয়। ১৯৮৬ সালে তেজষ্ক্রিয়তায় প্রাণহানি এড়াতে শহরটিতে
বসবাসরত ৪২ হাজার মানুষকে নিরাপদস্থানে সরিয়ে নেয় সোভিয়েত সরকার। এরপর থেকে
প্রিপিয়াত ভূতূড়ে শহর হিসেবেই দাঁড়িয়ে আছে। ধীরে ধীরে প্রকৃতির দখলে চলে যাওয়া
একসময়ের প্রাঞ্জল এই শহর এখন তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ব্যবহৃত হয়।
চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর ঐ এলাকা থেকে প্রায় সাড়ে
তিন লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু জীবজন্তু আর গাছপালা
সরিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল না। তাই তেজষ্ক্রিয়তার সর্বোচ্চ ক্ষতির সম্মূখীন হয়েছিল ঐ
এলাকার জীববৈচিত্র্য। এর ফলে চার বর্গমাইল এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা একটি পাইন বনের
সবগুলো গাছ অতিরিক্ত তেজষ্ক্রিয়তা টকটকে লাল রঙ ধারণ করেছিল। যে কারণে পরবর্তীতে
বনটির নাম রাখা হয় রেড ফরেস্ট। তবে জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির নাম যে
মানুষ, চেরনোবিল বিপর্যয় সেই কথাই আবারো মনে করিয়ে দেবে। এই এলাকায় গত তিন দশকের বেশী
সময় কোন মানুষের বসবাস নেই। যার ধারাবাহিকতায় তেজষ্ক্রিয়তার হুমকি সত্বেও এখানে
বিপুল সংখ্যক জীবজন্তুর বসবাস দেখা যাবে। প্রিপিয়াত শহরের বহুতল ভবনের বারান্দা আর
ছাদগুলো এখন পাহাড়ি ঈগলের বাসায় পরিনত হয়েছে। শহর আর গ্রামের রাস্তাগুলোয় বণ্য
ঘোড়া এবং হরিনের পাল অবাধে ঘুরে বেড়ায়। যে গুলো শিকারের জন্য সেখানে আছে নেকড়ের
দলও। জীববিজ্ঞানীদের দাবী অনুযায়ী শুধু মানুষের অনুপস্থিতির কারণেই এই চেরনোবিল
এলাকায় এমন জীববৈচিত্র্য চোখে পড়ে।
চেরনোবিল বিপর্যয়ের ২৫ বছর পর ২০১১ সালে এই স্থানটি পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। কারণ ততদিনে বসবাসের জন্য উপযোগী না হলেও সাময়িক ভ্রমনে চেরনোবিলের তেজষ্ক্রিয়তা আর প্রাণসংহারী মাত্রায় ছিল না। এরপর থেকে ধীরে ধীরে এই পারমানবিক পর্যটনকেন্দ্রটি ক্রমেই জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। বিভিন্ন ট্যুর অ্যাজেন্সি এখানে সপ্তাহব্যাপী ভ্রমনের আয়োজনও করে নিয়মিত। তবে এখনো এখানে আসা পর্যটকদের অধিকাংশই তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথে জড়িত।
Post a Comment