আফগানিস্তান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আফগানিস্তান পৃথিবীর ৪১ তম বৃহত্তম দেশ, মোট আয়তন ৬,৫২,২৩০ বর্গ কিলোমিটার। আফগানিস্তান একটি রুক্ষ এলাকা যার অধিকাংশ অঞ্চলই পর্বত ও মরুভূমিতে আবৃত।


বেশিরভাগ মানুষের কাছে, আফগানিস্তান নামটি শোনার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠবে যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত পথ-ঘাট, অস্ত্র সজ্জিত সেনার টহল, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল, ক্ষুধার তীব্রতা, অশিক্ষা, ভীষণ অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন একটি প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রের দৃশ্যপট। কিন্তু আমি যদি বলি আফগানিস্তান পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ গুলোর মধ্যে একটি! বিশ্বাস করবেন?


যদি বলি বিচিত্র ইতিহাস, চিন্তা, দর্শন এবং বহু ধর্মীয় বিশ্বাসের মিথস্ক্রিয়ার কেন্দ্র এই আফগানিস্তান, বিশ্বাস করবেন? যদি বলি আফগানরা জাতি হিসেবে দারুণ অতিথিপরায়ন, আনন্দ প্রিয় কিংবা বন্ধু বৎসল, তাহলে? হিসেব মিলবেনা অনেকের কাছেই!



আফগানিস্তান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?


দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজকের আফগানিস্তানের বিষাদপূর্ণ ইতিহাসের নীচেই চাপা পরে আছে তার নৈস্বর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অসংখ্য নজির। তুষারে ঢাকা পাহাড় চূড়া, মরুভূমি, উর্বর উপত্যকা, আমু দড়িয়ার তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আনাড়, আঙুরের বাগানের সৌন্দর্য ঢেকে গেছে শুধুমাত্র গত চার দশক ধরে চলা যুদ্ধে!


আফগানিস্তান যেমনই সুন্দর তেমনই রহস্যে মোড়া এক দেশ। এই আফগানিস্তানের মাটি থেকেই কত সুফি কবি সাধকের জন্ম হয়েছে! মৌলানা জালালউদ্দিন বালখী যিনি মৌলানা রুমি নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত তিনি তো উঠে এসেছেন এই প্রান্ত থেকেই। তাছাড়া মহাকবি ফেরদৌসি, হাকিম সানাই, হাকিম জামি এবং শেখ মহম্মদ রোহানি, ইমাম আবু হানিফা– এদের সবার সাথেই কোন না কোন ভাবে মিশে আছে আফগানিস্তানের আলো বাতাস।


সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে পড়ে অভিভূত হননি, এমন বাঙালি বইপ্রেমিক কি আদৌ মিলবে? ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বহু পথ পাড়ি দিয়ে মুজতবা আলী যখন ছুটে যাচ্ছিলেন কাবুলের পথে তখন তিনি আফগানিস্তানের মরুভূমির শূন্যতার দিকে তাকিয়ে নিমগ্ন হয়ে অবাক বিস্ময়ে বলেছিলেন-’মরুভূমির নিষ্ফলা জমিকে অগ্রাহ্য করে ফুলের গাছে কেমন নাছোড়বান্দার মতো ফুল ফুটেছে।’


সত্যিই, আফগানিস্তানের একটা দিক আমরা কেবল দেখি। যুদ্ধ, ধ্বংশ, অস্ত্র এইসব কিছুকে অগ্রাহ্য করে নাছোরবান্দা ফুলের মত কত ভাবেইনা মাধুর্য ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশটি। সুপ্রিয় দর্শক, আদ্যোপান্তের আজকের পর্বে বাংলার এই সবুজ শ্যামলিমা ছেড়ে আমরা পারি জমাব কাবুল, কান্দাহার, পাঞ্জিসিরের দেশে। জানব নতুন এক আফগানিস্তানকে।


পৃথিবীর ছাদ বলা হয় পামির মালভূমিকে। আর পামিরের দক্ষিণ পাদদেশে সাদা বরফের টুপি পরে থাকা অসংখ্য পর্বতসমৃদ্ধ স্থলবেষ্টিত এই দেশের সরকারি নাম আফগানিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র। দেশটি ইরান, পাকিস্তান, চীন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ও তুর্কমেনিস্তানের মাঝখানে ভূমি বেষ্টিত একটি মালভূমির উপর অবস্থিত। আফগানিস্তানকে অনেক সময় দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশ হিসেবেও গণ্য করা হয়।


আফগানিস্তান পৃথিবীর ৪১ তম বৃহত্তম দেশ, যার মোট আয়তন ৬,৫২,২৩০ বর্গ কিলোমিটার। দেশটির উত্তর-পশ্চিম, পশ্চিম ও দক্ষিণের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলি মূলত মরুভূমি ও পর্বতশ্রেণী দিয়ে ঘেরা। উত্তর-পূর্বে দেশটি ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে হিমবাহ-আবৃত পশ্চিম হিমালয়ের হিন্দুকুশ পর্বতের সাথে মিশে গেছে। আফগানিস্তানের উত্তর সীমানায় তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান, পূর্বে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং দক্ষিণে পাকিস্তান এবং পশ্চিমে ইরান।


ইন্দোচীনের আন্নাসী পর্বতমালা থেকে যে সব গিরিশ্রেণীর যাত্রা শুরু, তা হিমালয়, কারাকোরাম, হিন্দুকুশ প্রভৃতি নাম নিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত অতিক্রম করে ইরানের উত্তর পাশ দিয়ে কাস্পিয়ান সাগরের দিকে চলে গেছে। সেই গিরিশ্রেণীর পাশ কাটিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশের একমাত্র দরজাই হলো আফগানিস্তান।


আফগানিস্তান একটি রুক্ষ এলাকা যার অধিকাংশ অঞ্চলই পর্বত ও মরুভূমিতে আবৃত। শুধু পার্বত্য উপত্যকা এবং উত্তরের সমভূমিতে কিছু গাছপালা দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে এখানকার আবহাওয়া গরম ও শুষ্ক থাকে এবং শীতকালে পড়ে প্রচণ্ড শীত।


একটা সময় আফগান বলতে শুধুমাত্র পশতুদেরকেই বোঝাত। আজকের আফগানিস্তান রাষ্ট্র অবশ্য শুধু পশতুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু লোক আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে চলাচল করেছে, এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ এখানে বসতি স্থাপন করেছেন। দেশটির বর্তমান জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। পারস্যভাষী জাতিগোষ্ঠী, তাজিক ও তুর্কিভাষী এবং উজবেক অধ্যুষিত কিছু অঞ্চল, আধুনিক আফগানিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে ছোট আরব সম্প্রদায়ও দীর্ঘকাল ধরে বাস করে আসছে। মূলত সেনা, প্রশাসক ও বণিক হিসেবে তাদের আফগানিস্তানে পদার্পণ ঘটেছিল।


আফগানিস্তানের বর্তমান জনসংখ্যা আনুমানিক চার কোটি। ১৯৭৯ সালে আংশিক গণনার পর থেকে আফগানিস্তানে এখনও পর্যন্ত জাতীয় আদমশুমারি পরিচালিত হয়নি এবং বছরের পর বছর যুদ্ধ এবং জনসংখ্যার স্থানচ্যুতির কারনে সটিক ভাবে তা নির্নয় করাও যায়নি। তবে বর্তমান জনসংখ্যারর মধ্যে পশতুনরা জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশ। এছাড়াও আফগানিস্তানে আছে তাজিক, হাজারা, উজবেক, আইমাক, তুর্কমেন এবং বেলুচ জাতিগোষ্ঠীর বাস।


আফগানিস্তানের প্রধান ভাষা পশতু এবং দারি। মূলত দারি ফার্সি ভাষারই একটি রুপ। ১৯৬৪ সাল থেকে আফগানিস্তানে ব্যবহৃত ফার্সি ভাষাকে সরকারিভাবে দারি বলে ডাকা শুরু হয়। পশতু এবং দারি এই দুই ভাষার মধ্যে দারি ভাষার মর্যাদা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে পশতুন জাতির অনেকেই দারি ভাষায় কথা বলেন।


আফগানিস্তান ছিল প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষনায় দেখা গেছে উত্তর আফগানিস্তানে আজ থেকে প্রায় ৫০,০০০ বছর আগেও মানুষের বসবাস ছিল। ধারণা করা হয় আফগানিস্তানের কৃষি খামার বিশ্বের প্রাচীনতম খামারগুলোর একটি। এই অঞ্চলের ভৌগলিক গুরুত্ব প্রাচীন কাল থেকেই। কারণ এর তিনদিকে ছিল তিনটি বৃহৎ সভ্যতার অবস্থান। পশ্চিমে পারস্য, পূর্বে চীন এবং নিচে ছিল হিন্দুস্তানের অবস্থান আবার আফগানিস্তান নিজেই মধ্য এশিয়ার একটি অংশ। মধ্য এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতির বিকাশ ও আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে আফগানিস্তানের।


খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে আধুনিক কালের আগ পর্যন্ত আফগানিস্তানের বলখ, বামিয়ান, হেরাত, বদখশান ও কাবুল অবস্থিত ছিল প্রাচীন পৃথিবীর প্রধানতম বাণিজ্যপথের শাখা কিংবা প্রশাখার ওপর। সিল্করূট নামে পরিচিত এই্ বাণিজ্য পথের অনেকগুলো প্রবাহ ধরে চীন, ভারতীয় ও মধ্য এশীয় বিপুল সম্পদ পৌঁছে যেত রোম পর্যন্ত।


পথ যেখানে আছে সেখানে এসে জরো হয় নানা প্রান্তের নানা মত ও বিশ্বাসের। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রাচীন আমল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত জরথ্রুস্তীয়, গ্রিক, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান ও শিখ চিন্তাধারার বিস্তার ঘটেছে এই অঞ্চলে। এই পথেই বৌদ্ধ ধর্ম একটি পথে মধ্য এশীয় হয়ে তুর্কি জনপদগুলোতে হাজির হয়েছিল। বুদ্ধ মতবাদের সেই ছাপ এখনও লেগে আছে আফগানিস্তানের পাথুরে দেয়ালে। সঙ্গত কারণেই বহু পুরনো আমল থেকেই আফগানিস্তানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।


আবার এই ভৌগলিক অবস্থানের কারনেই আফগানিস্তানকে কম দুর্দশা পোহাতে হয়নি! আদি কাল থেক অদ্যাবধি আফগানিস্তানের অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও সম্পর্ক আছে তার এই ভৌগোলিক অবস্থানের। অসংখ্যবার দেশটি আক্রান্ত ও লুণ্ঠিত হয়েছে।


অসংখ্য রাজা ও রাজবংশের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে এখানে। হিন্দুস্তান দখলের স্বপ্নে বিভোর বাবুর তাই কাবুলকে প্রথম লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। বহু সাম্রাজ্যের পতনও ঘটেছে এই ভূখণ্ডেই। গত একশ বছরেই অন্তত তিনটি বড় সাম্রাজ্য, বৃটিশ, রুশ ও মার্কিনিদের আফগানিস্তানে সামরিক এবং রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছে। আফগানিস্তানকে তাই বলা হয় গ্রেভইয়ার্ড অব এম্পায়ার ।


একটা সময় পারসিক সাম্রাজ্যের একটা প্রদেশ ছিল আফগানিস্তান। আলেকজান্ডার শেষ পারসিক সম্রাট দ্বিতীয় দারিয়ুসকে পরাজিত করলে পারস্যের বাকি প্রদেশগুলোর মতোই আফগানিস্তানও হেলেনিক সভ্যতা নামে পরিচিত গ্রিক সাংস্কৃতিক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে দীর্ঘদিনের জন্য। আলেকজান্ডার নিজের নামে অনেকগুলো নগরের পত্তন করেছিলেন বিজিত অঞ্চলগুলোতে, যেগুলোর মধ্যে কেবল মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াই আজও স্বনামে টিকে আছে। আফগানিস্তানেও ছিল একটি আলেকজান্দ্রিয়া, বর্তমানে যা আই-খানুম নামে পরিচিত।


আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যটি তিনটি বড় খণ্ডে বিভক্ত হয়। এর একটি অংশ চলে যায় মহামতি আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাসের নিয়ন্ত্রণে। সেলুকাস নিয়ন্ত্রিত অংশের নাম হয় সেলুসিড সাম্রাজ্য। এরপর ভারতীয় মৌর্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোর দখল নিয়ে ব্যর্থ যুদ্ধ শেষে বর্তমান আফগানিস্তানের বড় অংশটিকে তারা মৌর্য সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেন শান্তির বিনিময়ে, এবং এই শান্তিকে স্থায়ী করতে সেলুকাসের কন্যার বিয়ে হয় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সঙ্গে।


এর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর সেলুসিডদের কাছ থেকে নিজেদের মুক্ত করে ব্যাকট্রিয় গ্রিকরা আফগানিস্তানের বাকি অঞ্চলগুলোকে মৌর্যদের হাত থেকে কেড়ে নেয় সম্রাট অশোকের মৃত্যুর কিছুকাল পর। ব্যাকট্রিয়াই আধুনিক আফগানিস্তানের বলখ প্রদেশ নামে পরিচিত। এতেও এক সময় ভাঙন ধরে, ইন্দোগ্রিক নামে পরিচিত আরেকটি ধারা আধুনিক আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের একটা অংশ দীর্ঘকাল শাসন করে। এদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতার দখল ণেয় শক নামে পরিচিত একটা বিখ্যাত যাযাবর ইরানি জনগোষ্ঠী, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে। এরপর আসে পার্থিয়ান শাসন।


তারপর এলো আফগানিস্তানের সবচেয়ে বিখ্যাত কুষাণ সাম্রাজ্য, এরা আরেকটি যাযাবর জনগোষ্ঠী, যারা গ্রিক সংস্কৃতি আর ভারতীয় ধর্ম উভয়ের সংমিশ্রণে বিপুল একটা সভ্যতা গড়ে তুলেছিল মধ্য এশিয়া থেকে ভারতের মথুরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। তারপর ইরানের ইতিহাসখ্যাত সাসানীয় রাজবংশের হাতে চলে যায় আফগানিস্তান। এরপর ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে আরবদের হাতে সাসানীয়দের পরাজয় ঘটলে কয়েক শত বছরের মুসলমান বিজয়ের সূত্র ধরে ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের নানা অঞ্চল বিজিত হতে থাকে, পারসিক সাফারিদ রাজবংশের আমলে কাবুলও ইসলামি সংস্কৃতির আওতায় আসে।


এই সময়ের পরও মধ্য এশিয়া থেকে আসা নিত্য-নতুন অসংখ্য তুর্কি ও মোঙ্গল যাযাবর জনগোষ্ঠী কিংবা সমরপতি আফগানিস্তানের নানা অংশ দখল করে রাজবংশ কায়েম করেছিল। সুলতান মাহমুদও ছিলেন তেমনই একজন। জন্মসূত্রে তিনি আফগান ছিলেন না। চেঙ্গিস খান ও তার পরবর্তী মোঙ্গল অধিপতিরা কখনো ভারতে প্রবেশ করতে না পারলেও আফগানিস্তান ভালোভাবেই মোঙ্গল দখলভুক্ত ছিল। হিন্দুস্তানে মোঘল সাম্রাজ্য স্থাপনের আগে ফারগানা ও সমরখন্দে ভাগ্যবিপর্যয়ের শিকার তরুণ বাবুর কাবুল দখল করেছিলেন ১৫০৫ সালে।


অবশেষে পারস্যের হাত থেকে স্থায়ীভাবে স্বাধীন হয়ে অষ্টাদশ শতক থেকে আধুনিক আফগানিস্তান আকার নিতে থাকে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে। তৃতীয় পানিপথ যুদ্ধের নায়ক আহমদ শাহ দুররানিকে বলা হয় আধুনিক আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। তবে আফগানিস্তানের বর্তমান সীমানা প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন এবং জারতান্ত্রিক রাশিয়ার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে উনিশ শতকের শেষের দিকে।


আফগান জাতি যে খুব পরিশ্রমী তা কিন্তু নয়। তারা জাতিগত ভাবে খুব আমুদে এবং আলাপ প্রিয়। না খেয়ে-দেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু আড্ডা মেরেই কাটিয়ে দিতে পারে তারা। আফগান মানুষের এই চরিত্র গঠনের পিছনেও আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থানকে কিছুটা দায়ী করা যেতে পারে। কারন পুরো আফগানিস্তানে আবাদযোগ্য ভূমির পরিমান খুব কম। তাই দেশটির মানুষের পেশাগত সক্ষমতা খুব কম। আফগান জনগোষ্ঠীগুলোকে প্রায়ই নির্ভর করতে হতো পশুপালন, সৈনিক পেশা অথবা ব্যবসা-বানিজ্যের উপর। যে কারনে তাদের মধ্যে এতটা স্বাধীনচেতা ও যুদ্ধাংদেহী মনোভাব এখনও বিদ্যমান।


আবাদি জমি কম হলেও আফগানিস্তানের মাটির নিচে আছে বিপুল সম্পদ। সেই সম্পদের পরিমান যে ঠিক কত, তা তারা নিজেরাও জানে না। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার পূর্ব ইউরোপীয় মিত্ররা ১৯৬০-৭০ এর দশকে আফগানিস্তানের ভূতাত্ত্বিক সম্পদের ওপর প্রথম কোন সমীক্ষা চালিয়েছিল। কিন্তু কয়েক দশক ধরে চলা যুদ্ধের কারণে সে সমীক্ষা তারা আর প্রকাশ করেনি। পরবর্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১০ সালে আফগানিস্তানের সাথে যৌথভাবে দেশটির ৩৪টি প্রদেশের ২৪টি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করে। সেই জরিপে উঠে আসে আফগান জমিনের নিচের রত্ন-ভান্ডারের কথা।


আফগানিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই পান্না ও রুবির অন্যতম প্রধান উৎস। এ তথ্য অনেকেরই জানা। কিন্তু আফগানিস্তানে যে এত খনিজ সম্পদ মজুদ আছে তা হয়ত ধারনা করেনি কেউ। আফগানিস্তানের মূল্যবান ধাতুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুদ আছে লোহা। দেশটিতে মোট ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মেট্রিকটন লোহা মজুদ আছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যা সবচেয়ে বেশি উত্তোলনযোগ্য লোহার মজুদ থাকা শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে একটি। শুধু লোহা আছে ভাবলে ভুল করবেন। আফগানিস্তানের বাদাখশানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তাখার ও গজনির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জাবুলের ২টি খনিতে আনুমানিক ২ হাজার ৬৯৮ কেজি সোনা মজুদ আছে। লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম সহ আফগানিস্তানে আনুমানিক ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন পৃথিবীর বিরল খনিজ সম্পদের ভান্ডার রয়েছে।


এত সম্পদ সঠিক উপায়ে কাজে লাগাতে পারলে আবার ভাগ্য ফিরতে পারে আফগানিস্তানের। শুধু তাই নয়, পঞ্চদশ শতকে নৌবাণিজ্য বৃদ্ধির কারনে আফগানিস্তানের স্থল বাণিজ্যপথের গুরুত্ব শেষ হয়ে গিয়েছিল একেবারেই কিন্তু এখন আবার সেই স্থল বাণিজ্য পথের গুরুত্ব পুনুরুদ্ধারের সুযোগ আসছে দেশটির সামনে। ইরানের চাবাহার বন্দর এবং পাকিস্তানের গদওর বন্দরকে কেন্দ্র করে আফগানিস্তান আবারও হয়ে উঠতে সক্ষম মধ্য এশিয়ার বিপুল খনিজ, তুলা, পশম, তেলবীজসহ নানান কাঁচামালের যাত্রাপথ। চীনের নতুন উত্থান ও নতুন সিল্করুটের বিস্তার সেই সম্ভাবনাকে আরও গভীর করেছে।


অনেক সম্ভাবনা থাকার পরেও অনেক কিছু হতে পারেনি গত ৩০ বছর ধরে চলা স্থায়ী অশান্তির কারণে। মধ্যযুগের একটা পর্বে ইতিহাসের যে বাঁকবদল আফগানিস্তানকে পাশে সরিয়ে দিয়েছিল, আরেকটি মোড় পরিবর্তন আফগানিস্তানকে আবারও দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য গ্রন্থিতে পরিণত করার বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে।


যদিও এগুলো এখনো সবই সম্ভাবনামাত্র। সম্ভাবনার পূর্ণবিকাশে আছে বহু বাধা। কেননা, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবেশ এখনও মেঘে ঢাকা। যুদ্ধ থেমেছে যদিও, তবুও নানা হিসাব-নিকাশ আছে এখানে। তবে সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে আফগানিস্তানের মানুষেরা যদি তাদের নিজেদেরকে আত্মসচেতন ও নিজের পায়ে দাঁড়ানো মনোবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে পারে তবেই না নতুন এক আফগানিস্তানকে দেখতে পাবে বিশ্বাবাসী।

0/আপনার মতামত জানান/Comments