বতসোয়ানা কিভাবে এত ধনী হলো?

সাব সাহারান আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানা। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বতসোয়ানা ছিলো তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মতই। স্বাধীনতার সময় দেশটি ছিল বিশ্বের তৃতীয় দরিদ্রতম দেশ।

সাব সাহারান আফ্রিকা, বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রতম এই অঞ্চল দাস ব্যবসার অন্যতম ভুক্তভোগীও বটে। এক সময় ইউরোপীয় শক্তিগুলো পুরো অঞ্চলটিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করেছিলো। পরবর্তীতে দেশগুলো একে একে স্বাধীন হলেও ক্ষমতায় বসা স্বৈরাচারী শাসকরা ঔপনিবেশিক আমলের বৈষম্যপূর্ণ নিয়ম নীতির বিলোপ তো করেইনি বরং এগুলোর আরও বিস্তার ঘটিয়েছে। আর এসব কারণেই অঞ্চলটি রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও দারিদ্রের জালে আবদ্ধ হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরেই।


আর এর ফলস্বরূপ বিগত ৫০ বছরে দেশগুলোতে আমরা যা দেখেছি তা হচ্ছে : ৩০ টি গৃহযুদ্ধ, শত শত সশস্ত্র সংঘাত এবং ৭ টি গণহত্যার মতো বিভিষীকাময় অধ্যায়ের। আর এ কারণেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করা ১০ টি দেশের মধ্যে ৯টির অবস্থানই এই অঞ্চলে। প্রাকৃতিক সম্পদে সবচেয়ে সমৃদ্ধ এই মহাদেশের মানুষরা আটকে আছে দারিদ্র ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থার এক চক্রে ।
এত কিছু সত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে আফ্রিকাতে এমন একটি দেশ রয়েছে যেটি অন্য সব দেশ থেকে একেবারেই আলাদা।



বতসোয়ানা কিভাবে আফ্রিকার সবেচয়ে ধনী দেশগুলোর একটি হলো?


কালাহারি মরুভূমি। প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে আগুনের প্রথম ব্যবহারের প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়। স্বল্প পরিচিত বতসোয়ানা দেশটির অবস্থানও এখানে। জীবনমান ও সম্পদের বিচারে দেশটি রয়েছে বেশ ভালো অবস্থানে। এমনকি স্থলবেষ্টিত মরূভূমির এই দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশগুলোরও একটি। বিগত ৫০ বছরে দেশটির অর্থনীতির আকার বেড়েছে প্রায় ৪০ গুণ।

 

তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সকল দিক দিয়েই ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বতসোয়ানা ছিলো তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মতই। স্বাধীনতার সময় দেশটি ছিল বিশ্বের তৃতীয় দরিদ্রতম দেশ। কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে বতসোয়ানার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামো দেশটিকে আফ্রিকার সবচেয়ে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছে। এক সময় চরম দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করা জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থারই শুধু উন্নয়ন ঘটেনি এটি এখন একটি শান্তিপূর্ণ দেশ। বর্তমানে বতসোয়ানা একটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং আফ্রিকার যে গুটিকয়েক দেশ উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে পেরেছে, বতসোয়না তাদেরই একটি।

 

কিন্তু কিভাবে সম্ভব হলো এই ব্যাপক উন্নয়ন? আর কেনইবা বতসোয়না তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলি থেকে একেবারেই ভিন্ন?

 

এক সময় আফ্রিকা মহাদেশটিকে কব্জা করা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মধ্যে ব্রিটিশরা যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেসময় বিশ্বের এক চতুর্থাংশ এলাকা ব্র্রিটিশ সাম্রাজ্যের দখলে।

 

বতসোয়ানা, যার পূর্বনাম ছিলো বেচুয়াল্যান্ড, ১৮৮৫ সালে এ দেশটি ব্রিটিশ প্রোটেকটোরেট বা আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। যদিও ব্রিটিশরা বতসোয়ানাকে কখনোই অতটা গুরূত্বপূর্ণ মনে করেনি। তবে দুটি কারণে বতসোয়ানা যে একেবারে গুরুত্বহীন ছিলো তাও নয়। প্রথমত দেশটি ছিলো আফ্রিকার মধ্যভাগে প্রবেশের একটি করিডোরের মতো। আর দ্বিতিয়ত, আফ্রিকায় জার্মানদের উপনিবেশ বিস্তার ঠেকানোর জন্য বতসোয়ানার নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদেরও একটা বাড়তি সুবিধা দিয়েছিলো। ফলে বতসোয়ানা বা বেচুয়াল্যান্ড সরাসরি ব্রিটিশ উপনিবেশ না হলেও পরোক্ষভাবে ছিলো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে।

 

কিন্তু বিপত্তি বাধলো ১৮৯০ সালে সিসিল রোডস কেইপ কলোনির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর। বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার একটি অংশ কেইপ কলোনী তখন কাগজে কলমে ব্রিটিশ শাসনভুক্ত হলেও সিসিল রোডস তার ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানির মাধ্যমে বলতে গেলে একচ্ছত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন।

 

কেইপ কলোনি বা বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকাতে মাইনিং ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনত্যম পৃষ্ঠপোষক সিসিল রোডস। ব্যক্তিগত সম্পদ, প্রভাব ও রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে রোডস তার সাম্রাজ্যকে রোডেশিয়া যা বর্তমানে জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে নামে দুটি দেশ, সে পর্যন্ত বিস্তার ঘটান।

 

পরোক্ষভাবে রোডেশিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হলেও রোডস কিন্তু তার ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজেই একে ব্যবহার করছিলেন। রোডেশিয়ার নামকরণও হয় তার নামানুসারে। সেখানকার সাধারণ মানুষেরা ছিলেন চরম জুলুম ও অবিচারের শিকার। রোডস অত:পর তার লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন বতসোয়ানার দিকে। এমনকি, ব্রিটিশ সরকারও বতসোয়ানাকে রোডেশিয়ার অন্তুর্ভুক্ত করার বিষয়ে সম্মতি দেয়। আর এর ভয়ই করছিলেন বতসোয়ানার গোত্রপ্রধানরা। তারা বুঝতে পেরেছিলেন রোডস এর ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানির অধীনে গেলে তাদের অবস্থাও হবে রোডেশিয়ার মতো।

 

ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে আসার আগে বতসোয়ানা, বিভিন্ন গোত্রপ্রধান যাদের সোয়ানা নামে অভিহিত করা হতো, মূলত তাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। আর এই সময় এসে, এই গোত্রপ্রধানরাই সিদ্ধান্ত নেন রোডেশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বদলে ব্রিটিশ প্রোটেকটোরেট হিসেবে থাকার। তবে, মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিগত শতাব্দিতে আফ্রিকার মধ্যভাগে প্রবেশে ওলন্দাজদের নিরলস প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করে আসছিলো এই সোয়ানারাই।

 

যাই হোক, বতসোয়ানার তিন জন গোত্রপতি ১৮৯৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে নোঙ্গর করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো খুবই সাধারণ। তাদের দাবি ছিলো ব্রিটিশ সম্রাট যেন নিজে সরাসরি বতসোয়ানার শাসনভার নেন। যাতে দেশটি সিসিল রোডস এর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।

 

ঐ তিন গোত্রপতি তাদের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য পুরো ইংল্যান্ড সফর করেন। সৌভাগ্যবশতঃ ঐ সময়েই সিসিল রোডস দক্ষিণ আফ্রিকার পাশের দেশ ট্রান্সভালে একটি ব্যর্থ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে ব্রিটিশরাজের বিরাগভাজন হন। ফলে শেষপর্যন্ত বতসোয়ানায় সরাসরি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণই বজায় থাকে।

 

তবে গোত্র প্রধানরা আগের মতই তাদের দেশ নিজেদের দেশীয় আইন ও রীতি নীতি দ্বারা পরিচালনা করার অনুমতি লাভ করেন। ব্রিটিশদের চোখে বতসোয়ানার গূরত্ব মূলত তার রেলপথের কারণেই ছিলো, এ কারণে এই দেশটি ঔপনিবেশিক শোষণের হাত থেকে অনেকাংশেই রক্ষা পেয়েছিলো।

 

আর এ কারণেই তাদের নিজস্ব প্রথাগত অনন্য শাসন পদ্ধতিটাও সোয়ানার নেতৃবর্গ টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। মূলত জনসাধারণের আশা আকাঙ্খার দিকে লক্ষ রেখেই দেশ পরিচালনা করতেন গোত্র প্রধানরা। গোত্রপ্রধানদের বৈঠকে সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা ছাড়াও ঝগড়া বিবাদের মিমাংসা যেমন হতো তেমনি কর নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয়ের সিদ্ধান্তও নেয়া হতো। এখানে সমাজের সকল স্তরের মানুষই তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পেতেন। বৈঠকে নেতৃবর্গের সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়াও দুর্লভ কোনো ঘটনা ছিল না।

 

সৌভাগ্যবশত: বতসোয়ানার এই গণতান্ত্রিক চর্চা ব্রিটিশ শাসনআমলেও অনেকটাই টিকে ছিলো। বতসোয়ানার সাথে অন্যান্য সাব সাহারান দেশেগুলোর আর্থ- সামাজিক অবস্থার পার্থক্য মূলত এখান থেকেই শুরু হয়েছে।

 

১৯৬৬ সালে বতসোয়ানা যখন স্বাধীনতা লাভ করে তখনও কিন্তু এটি বিশ্বের তৃতীয় দরিদ্রতম দেশ। দেশটিতে তখন শুধুমাত্র ১২ কিলোমিটার পাাঁকা রাস্তা ছিলো। আর ছিলেন মাত্র ২২ জন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েট। সেসময় দেশটির মাত্র ১৪% ভূমি ছিলো আবাদযোগ্য আর বাদবাকি অংশ শুষ্ক মরূভূমি। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নাব্য নদী না থাকা আর স্থলবেষ্টিত হওয়ার কারণে পরিবহন খরচ ছিলো অনেক বেশি। পাশ্ববর্তী দেশগুলোও বন্ধুসুলভ না হওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। এত প্রতিকূলতা সত্বেও বতসোয়ানা এখন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ এবং সাব সাহারান দেশগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ।

 

নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে কিভাবে দেশটি ছাড়িয়ে গেল আফ্রিকার অন্যান্য দেশকে?

 

স্বাধীনতার ঠিক পরপরই দেশে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর সাথে সাথে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রাও শুরু হয়। এই উন্নয়ন আরও জোরালো হয়েছিলো মূলত তিনটি কারণে।

 

প্রথমত, নেতৃবর্গের যাবতীয় কর্মকান্ডের বিষয়ে জনগণের নিকট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিদ্যমান প্রথা। দিতিয়ত, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকদের হস্তক্ষেপ থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকা এবং তৃতীয়ত, সম্ভ্রান্ত ও শাসক শ্রেণীর অবদান।

 

১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বতসোয়ানার অর্থনীতি অনেকাংশেই পশুপালনের উপর নির্ভরশীল ছিলো। আর তা ছিলো মূলত গোত্রপ্রধান ও সম্পদশালী কৃষকদের দখলে। আর এ কারণেই তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য স্বাধীনতার পরপরই তারা একটি নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সম্পদ আইন প্রণয়ন করে। এর পাশাপাশি বতসোয়ানাবাসী দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেয়েছিলো স্যার সেরেতসা ক্ষামার মতো এমন একজন ব্যক্তি কে, যিনি ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। দেশের স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে তিনি তার রাজনৈতিক জীবন ব্যয় করেছেন গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বতসোয়ানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

 

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জোরদার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ক্ষামা। আর ১৯৬৭ সালে দেশটির ওরাপায় আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হীরার খনির আবিষ্কার তার উচ্চাভীলাষী পরিকল্পনায় ব্যাপক গতি সঞ্চার করেছিলো। ফলত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বদলে রপ্তানীমুখি অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় সফলতার মুখ দেখতে থাকে দেশটি। মাংস, তামা এবং হীরা হয়ে উঠে দেশটির অন্যতম রপ্তানী পণ্য।

 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান, মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা, নিম্ন কর এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গঠনমূলক গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে বতসোয়ানার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ক্ষামা। এছাড়া, গোত্রীয় সংঘাত বন্ধ করে জাতিগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সোয়ানা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজির প্রচলন এবং সর্বোপরী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বতসোয়ানাকে বলতে গেলে একটি সফল রাষ্ট্রে পরিণত করেন তিনি।

 

বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৬০ এর দশক থেকে ১৯৮০র দশক পর্যন্ত বতসোয়ানা ছিলো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি।

 

বলতে পারেন, প্রায় আড়াই মিলিয়ন মানুষের দেশে একটি হীরা খনিই, অর্থনীতির চিত্র রাতারাতি পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু শুধু হীরা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই যে দেশটি তরতর করে এগিয়ে যাবে এটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আফ্রিকার অনেক দেশই প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা অচলাবস্থা সে দেশগুলোকে দিন দিন আরো দরিদ্র করে তুলেছে। এখানেই, বতসোয়ানার সাথে অন্যান্য দেশের পার্থক্য। দেশটিতে বিদ্যমান শক্তি শালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হীরার খনি থেকে উপার্জিত অর্থকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে। আর এ কারণেই অফ্রিকার মধ্যে বতসোয়ানার অবকাঠামো ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবস্থান সামনের সারিতে। স্বাক্ষরতার হারে দেশটি আফ্রিকার মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ এবং ৯১ ভাগ শিশু এখন স্কুলগামী। পাশাপাশি বতসোয়ানা আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ। আর এসব কারণেই আফ্রিকার মধ্যে বতসোয়ানার এই অগ্রযাত্রাকে বিস্ময়কর বলাই যায়।

 

এতকিছু সত্বেও বতসোয়ানা যে ঝুকির মধ্যে নেই তা কিন্তু বলা যায় না। খুব তাড়াতাড়ি বতসোয়ানার হীরার ভান্ডার ফুরিয়ে না গেলেও, একদিন কিন্তু তা হবে। ডেমোক্রটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ভেনিজুয়েলা বা আ্যাংগোলার মত অবস্থা যদিও বতসোয়ানার হয়নি, কিন্তু দেশটির অর্থনীতির সিংহভাগই একটি মাত্র খাতের উপর নির্ভরশীল। রপ্তানী আয়ের ৮৯ ভাগ, জি ডি পির ২৫ ভাগ বা সরকারের রাজস্ব আয়ের ৪০ ভাগই আসে এই খনি শিল্প থেকে। এমনকি দেশের অন্যান্য সকল ধরণের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন কিন্তু এই হীরা খনি থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ থেকেই হয়েছে। আর এই একটি মাত্র খাতের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীলতাই হচ্ছে দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। যা খুব সহজে সমাধান হবারও নয়।

 

বিগত ২০ বছরে বতসোয়ানার অর্থনীতিতে বিকল্প খাত সৃষ্টির অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তেমন কোন সুফল পাওয়া যায়নি। অনেকের মতে, বতসোয়ানার অর্থনীতি হল মালবাহী বিশাল কার্গো জাহাজের মতো। যেটি সহজেই যে কোনো দিকে দিক বদলাতে পারে। তবে সে তার সামনের সম্ভাব্য অনাগত বিপদকে তখনই এড়াতে পারবে, যদি এই দিক পরিবর্তন সময়মত হয়। আর এক্ষেত্রে এই মোড় নেওয়া হলো আরও কার্যকর উৎপাদন ও সেবা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

 

এটিই একমাত্র সমস্যা নয়। দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ একটিমাত্র খাতের উপর নির্ভরশীল হওয়ায়, এটা অস্বাভাবিক নয় যে সম্পদের বড় একটা অংশ গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত হয়ে থাকবে। বতসোয়ানার অধিকাংশ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা সাব সাহারান অন্যান্য দেশের চেয়ে ভালো হলেও দেশটির বড় একটা অংশ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। এমনকি গবেষণা অনুযায়ী, দেশটির ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সম্পদের ব্যবধানও অনেক বেশি।  

 

যাই হোক, অশপাশের দেশগুলোর বিবেচনায় বতসোয়ানার এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। ব্যাপক প্রবৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় স্থিতীশীলতা ও খনিজ সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বতসোয়ানা সারা বিশ্বকেই চমকিত করেছে। যদিও, বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে চূড়ান্ত রূপ দেয়া এবং সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য দেশটির আরও অনেক কিছু করার বাকি আছে।

 

পরিশেষে বতসোয়ানার এই নাটকীয় উত্থান দেখে এটাই বলা যায় যে, কোনো জাতির উন্নতি ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার পেছনে তার ইতিহাস, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা খুবই গুরূত্বপূর্ণ।

0/আপনার মতামত জানান/Comments