ইউরি গ্যাগারিন ও ভস্টক-১ | মানুষের মহাকাশ বিজয়ের মহাকাব্য



“উপস্থিত জনতা আমাকে দেখার জন্য বৃষ্টি উপেক্ষা করেও দাঁড়িয়ে আছেন, আমি কিভাবে ছাতা মাথায় দিয়ে তাদের কাতার থেকে সরে যাই !!”

ইংল্যান্ডের ম্যানচেষ্টার শহরের উৎসাহী জনসাধারণের অভিনন্দন এভাবেই গ্রহণ করেছিলেন মহাকাশে ভ্রমণকারী প্রথম মানুষ, নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন।

সোভিয়েত নাগরিক ইউরি গ্যাগারিন, ভস্টক-১ নভোযানে চড়ে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ প্রদক্ষিন করে প্রথম নভোচারী মানব হওয়ার বিরল সম্মান অর্জন করেন। সেইসাথে সফল মিশন ভস্টক-১ এর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন উন্মোচন করে মানব ইতিহাসের এক অন্যতম অধ্যায়! চলুন জেনে আসি মহাকাশ বিজয়ের ও অজানাকে জানবার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, মানব-বাহক নভোযান ভস্টক-১ ও নভোচারী ইউরি গ্যাগারিনের দুঃসাহসিক যাত্রা সম্বন্ধে।


 

ইউরি গ্যাগারিন- মহাকাশের মহাকাব্যিক অভিযাত্রী


শুরুতেই বলে রাখি, ইউরি গ্যাগারিন ই কিন্তু মহাকাশ জয় করে ফিরে আসা প্রথম জীবিত প্রাণ নয়। ১৯৬০ সালের আগস্টে, স্পুটনিক-৫ স্যাটেলাইটে চেপে, বেলকা আর স্ট্রেলকা নামের দুটি কুকুর, একটি খরগোশ ও ৪২টি ইঁদুর মহাকাশে ঘুরে নিরাপদ ও জীবিত অবস্থায় ফিরে আসে পৃথিবীতে। তবে ইতিহাসে, গ্যাগারিন ই প্রথম মহাকাশ ভ্রমণকারী মানুষ এবং ভস্টক-১ ই প্রথম নভোযান যে-টি কোনো মানুষকে মহাশূন্যে বহন করে নিয়ে যায়!


তৎকালীন সোভিয়েত সরকারের তত্ত্বাবধানে সোভিয়েত স্পেস প্রোগ্রামের অধীনে এই মিশনটি পরিচালিত হয়, যার ডিজাইনার-জেনারেল ছিলেন সার্জেই করোলেভ (Sergei Korolev)। Vostok 3KA Spacecraft তথা ভস্টক-১ মহাকাশযান এর প্রধান ডিজাইনার ছিলেন ওলেগ আইভোনস্কি (Oleg Ivanovsky)। উড্ডয়নকালে এ মহাকাশযানের ওজন ছিলো ৪৭২৫ কেজি। এবং পৃথিবীর ফেরত আসার কালে ওজন ছিলো ২৪০০ কেজি। নভোযানটির মূল অংশ দুইটি অংশে বিভক্ত ছিলো। এর Spherical বা বর্তুলাকার মোডিউলের ব্যাস ছিলো ২.৩ ডায়ামিটার বা প্রায় ৭ ফিট, যা তৈরি করা হয়েছিলো নভোচারীর অবস্থানের জন্য। এবং biconical বা ডিশ আকৃতির মোডিউলটি ছিলো ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির জন্য, যার প্রস্থ ছিলো ২.৪৩ ডায়ামিটার বা ৮ফিট। সম্পূর্ণ অটোমেডেট ভস্টক-১ ক্যাপসুলটি নির্মিত হয়েছিলো মাত্র ১ জন নভোচারীর উপযোগী করে। এর গোলাকার আকৃতিটি দেওয়া হয়েছিলো, নির্দিষ্ট কোনো সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি যাতে না থাকে সে দিকে নজর রেখেই।


১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল, দূর মহাকাশে ভস্টক-১ পাড়ি জমিয়েছিলো। বৈশ্বিক সময়ের হিসাবে, সকাল ৬টা ৭ মিনিট এ মহাকাশযান প্রথমবারের মতো মানুষ বহন করে অভিকর্ষজ বলের বাধা পেরিয়ে, ভূপৃষ্ঠ ছেড়ে যাত্রা করে। মহাশূন্যে এক শ্বাসরোধী-উত্তেজনাকর যাত্রা সম্পন্ন করে পুনরায় প্রবেশ করে পৃথিবীর-বায়ুমণ্ডলে। রাশিয়ানদের সৌভাগ্য যে ব্যর্থতার এক প্রায় সুনিশ্চিত গহ্বর থেকে মহাকাশযানটি সেদিন অলৌকিকভাবে পৃথিবীর বুকে সফলভাবেই ফিরে এসেছিল।


পুরো মিশনটি সম্পন্ন হতে মোট সময় লেগেছিলো মাত্র ১০৮ মিনিট, যার মধ্যে ভস্টক-১ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করেছিলো ৮৯ মিনিট। যাত্রার বেশিরভাগ সময়জুড়ে, নভোযানটির গতিবেগ ছিল প্রতি ঘন্টায় ১৭,৫০০ মাইল বা সেকেন্ডে অন্তত ৫ মাইল। মহাকাশযানটি সর্বমোট ভ্রমণ করেছিলো ৭৫,৬৭৮.৬৬২ মাইল। এটি পৃথিবী থেকে ২০৩ মাইল বা ৩২৭ কিলোমিটার উচ্চতায় প্রদক্ষিণ করেছিলো। যদিও এই উচ্চতা বর্তমানের হিসেবে খুবই অল্প। কিন্তু ১৯৬১ সালে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধার কথা হিসেব করলে এটি মোটেও কম ছিলো না। তৎকালীন অন্যান্য দেশ, এমনকি স্পেইস রেস এর প্রধান বিপক্ষ শক্তি, আমেরিকাও তখনো ভস্টকের কাছাকাছি কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি। তাই ভস্টক-১ এর যাত্রা ছিলো মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


সৌভিয়েত ইউনিয়নের এর ভস্টক প্রোগ্রাম ছিলো মূলত আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা মিশন মার্কারির বিরুদ্ধে এক গোপন প্রতিযোগিতা। কে প্রথম কোনো মানব-বাহী যান পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরিয়ে আনতে পারে- তাই ছিলো এ প্রতিযোগীতার মূল লক্ষ্য। ভস্টক প্রোগ্রামকে সফল করতে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬১ সালে বেশ কয়েকবার ভস্টক রকেট ফ্যামিলি, স্পেস ক্যাপসুল এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করা হয়, যা চলছিলো বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ গোপনে।


সেই ধারাবাহিকতাতেই, ভস্টক প্রোগ্রামের নিয়ন্ত্রণে, ১৯৬০ সালে বহু শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা- নিরীক্ষার পর ২০০ জন প্রার্থী থেকে ২০ জন কে বাছাই করা হয় ভস্টক -১ এর জন্য। সেই ২০ জনকে বছর ব্যাপী নানা প্রশিক্ষণ এর পথ পাড়ি দিতে হয়। তন্মধ্যে, ১৭ জন ক্যান্ডিডেট এর ভোটে নির্বাচিত হন ইউরি গ্যাগারিন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান কর্মকর্তা নিকোলাই কামানিন (Nikolai Kamanin) এর পরবর্তী বিবেচনায় ছিলেন, নভোচারী ক্যান্ডিডেট গ্যেরম্যান তিতোভ (Gherman Titov)। পরবর্তীতে গ্যাগারিনই ভস্টক-১ এর জন্য নির্বাচত হন কারণ তার খর্বাকৃতি দেহ নভোযানটির সাথে মানানসই ছিলো।


ভস্টক-১ এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিলো গ্রাউন্ড স্টেশনে। মূলত অধিকাংশ ফাংশনই ছিলো অটোমেটেড। নভোচারীর হাতে কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিলো না। এর কারণ হল- তখন পর্যন্ত স্পেসক্রাফ্ট ইঞ্জিনিয়াররা জানতেন না, ওজনহীনতায় কিংবা প্রচন্ড বেগে ধাবমান একজন মানুষ কিভাবে সাড়া দিতে পারে।


১১ই এপ্রিল, ১৯৬১, উড্ডয়নের ঠিক একদিন আগে, ভস্টক-১ (vostoc 3KA space capsule) নভোযানকে লঞ্চ (Launch) প্যাডে নিয়ে যাওয়া হয়। যান্ত্রিক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে সবকিছু ঠিক আছে কি-না যাচাইয়ের পর, গ্যাগারিন ও ব্যাক-আপ নভোচারী তিতভকে ফ্লাইট প্ল্যান সম্পর্কে শেষবারের মতো ব্রিফ দেওয়া হয়। পরেরদিন, ১২ই এপ্রিল, রাশিয়ান আঞ্চলিক সময় ৯টা বেজে ৭ মিনিটে ভস্টক-১ পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে যাত্রা করবে। এই সময়টিকে বেছে নেবার পেছনেও ছিলো বিশেষ কারণ। অটোমেডেট রকেটের অভ্যন্তরে ছিলো সূর্যরশ্মির প্রতি সংবেদনশীল এক বিশেষ সেন্সর। যার মাধ্যমে ল্যান্ডিং ক্যাপসুলটি মূল মোডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কার্যকরী হবার কথা ছিলো।


বৈশ্বিক সময়ের হিসাবে, ৬টা বেজে ৭ মিনিটে বইকনুর স্পেসপোর্ট (Baikonur Sapceport) থেকে জেনারেল করোলেভ উড্ডয়নের ঘোষণা দেন। উড্ডয়নের দুই মিনিটের মাথায় ভস্টক রকেটের গতিবর্ধন করে মূল যান থেকে থেকে রকেটের বুস্টার মোটর চারটি বিচ্ছিন্ন হয়। এর একমিনিট পর একটি অপটিক্যাল ওরিয়েন্টেশন ডিভাইস Vzor এর সহযোগীতায় গ্যাগারিনের পায়ের দিকে একটি জানালা উন্মোচিত হয়। উড্ডয়নের ৫ মিনিট পরেই, পৃথিবীর বাইরে থেকে পৃথিবীকে দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন গ্যাগারিন। ৬ মিনিটের মাথায়, মূল যানটি ক্যাপসুল ও ফাইনাল রকেট -এই দুই অংশে বিভক্ত হয়ে যায়।


কিছুক্ষণ পর পর, গ্যাগারিন গ্রাউন্ড স্টেশনকে রেডিওর মাধ্যমে নিশ্চিত করছিলেন যে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। উড্ডয়নের ৯ মিনিট পর, ভস্টক রকেট পৃথিবীর অভিকর্ষের বন্ধন ছিন্ন করে। গ্যাগারিন গ্রাউন্ড স্টেশনকে জানান- সব সিস্টেম ঠিকঠাক আছে, ওজনহীনতার অনুভূতি খুবই দারুণ, যাত্রা চলমান!


এতক্ষণ পর্যন্ত গ্রাউন্ড স্টেশনের সাথে গ্যাগারিনের রেডিও যোগাযোগ চালু থাকলেও, কথা হবার মাঝখানেই তা হুট করে বন্ধ হয়ে যায়, কেননা রকেটটি ততক্ষণে বইকনুর স্টেশনের রেডিও রেঞ্জের বাইরে চলে গেছে। ১১ মিনিটের মাথায়, ভস্টক-১ সাইবেরিয়াতে প্রবেশ করে। ২৫ মিনিট পরে, খাবারস্ক (Khabarovsk) গ্রাউন্ডস্টেশনের সাথে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপিত হয় ভস্টক-১ রকেটের। ফলে গ্যাগারিন তার যাত্রার অবস্থা পুনরায় নিশ্চিত করার সুযোগ পান। এতক্ষণ গ্রাউন্ড স্টেশনের রেডিও রেঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো ভস্টক-১। এরপর রকেটটি নর্থ প্যাসিফিকে প্রবেশ করে, যার দিগন্তে তখন ঘটছে সূর্যাস্ত।


উড্ডয়নের এর ৩০ মিনিটের ভেতর, ভস্টক-১ বিস্তীর্ণ প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেয়। শীঘ্রই ভস্টক-১ আমেরিকার ওপর দিয়ে ভ্রমণ করে, আমেরিকার ঘুমন্ত জনগণ তখন জানেনা সোভিয়েত ইউনিয়নের এই মহাকাশ বিজয়ের কথা। পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণকারী গ্যাগারিন তখন ভস্টক-১ এর জানালা দিয়ে দেখছেন রাতের পৃথিবী।


এক ঘন্টা উড্ডয়নের পর ভস্টক-১ কে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার হিসাবকিতাব শুরু হয় গ্রাউন্ডস্টেশনে। কিন্তু, কোথাও একটা গন্ডগোল বাঁধে! ভস্টক-১ যখন আফ্রিকার উপরে, তখন সার্ভিস মোডিউল থেকে রি-এন্ট্রি ক্যাপসুলটি অটোমেটেড সেন্সরের সহায়তায় আলাদা হয়ে যাবার কথা থাকলেও, সেগুলি তখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। মিশরের আকাশের অনেক ওপরে, নভোযানটির দুটো অবিচ্ছিন্ন অংশ- সার্ভিস মোডিউল ও রি-এন্ট্রি ক্যাপসুল- বায়ুমণ্ডলের উর্ধ্বঅংশে প্রচন্ড তাপে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ঘুরতে থাকে।


ক্যাপসুলের ভেতরে আটকা পড়া পৃথিবীর প্রথম মহাকাশচারী মানব ইউরি গ্যাগারিন তখন উপলব্ধি করতে পেরেছেন অনিয়ন্ত্রিত কিছু একটা ঘটছে, কেননা ক্যাপসুল আর সার্ভিস মোডিউল তখন প্রচন্ড বেগে কক্ষপথে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তার শরীর তখন ১০ গুণ অভিকর্ষজ বল অনুভব করছে। গ্যাগারিন এর ভাষ্যমতে ২-৩ সেকেন্ডের জন্য তার কাছে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যায়। অবশেষে, ভূমধ্যসাগরের ওপরে ক্যাপসুল ও সার্ভিস মোডিউল আলাদা হয়। ততক্ষণে ভস্টক রকেটের সাথে সকল অটোমেটেড যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় গ্রাউন্ডস্টেশন পুরোপুরি ধোঁয়াশায়। তখনো কেউ জানেনা, এক বিশাল ব্যর্থতার হাত থেকে তারা বেঁচে গেছেন। আজও বিতর্ক আছে কেন এই অনিয়ন্ত্রিত ঘটনাটি ঘটেছিলো আর কোন সৌভাগ্যেই বা তা স্বাভাবিক হয় তা নিয়ে।


কেউ কেউ দাবী করেন, মোডিউলগুলোর সাথে সংযুক্ত কেবল বা তার প্রচন্ড উত্তাপে পুড়ে যাওয়ায় সেগুলি আলাদা হতে পেরেছিলো। আবার কারো দাবী, হিসবা মোতাবেকই, তাপমাত্রা সেন্সর মোডিউলগুলিকে বিচ্ছিন্ন করেছিলো। যাইহোক, মোডিউলগুলি শেষমেষ আলাদা হওয়ায়, রিএন্ট্রি ক্যাপসুল সফলভাবে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু, বায়ুমন্ডলে ফিরে ল্যান্ডিং ক্যাপসুলের থার্মাল প্রোটেকশন যায় ভেঙে, ভেতরে অবস্থানরত গ্যাগারিনও সেই প্রচন্ড পোড়া গন্ধ টের পান।


ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭ কিলোমিটার উচ্চতায়, গ্যাগারিন ক্যাপসুল থেকে বের হবার উপায়টিকে ব্যবহার করেন। তিনি ইজেকশন সিটে করে ক্যাপসুল থেকে আলাদা হয়ে যান এবং প্যারাসুটে করে ভূপৃষ্ঠতলে অবতরণ করেন। আধুনিক নভোযান গুলোতে পৃথিবীতে ফেরার জন্য থ্রাস্টার থাকে, যেটি চালু হয় ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এলে। থ্রাস্টারের কাজ উপরের দিকে বল প্রয়োগ করা। এটি মহাকাশযানের গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে নিরাপদে অবতরণ করতে সাহায্য করে। কিন্তু ভস্টক-১ এ কোনো থ্রাস্টার ছিল না। ফলে, গ্যাগারিনের জন্য একমাত্র উপায় ছিল ভূপৃষ্ঠের অন্তত ৪ মাইল উপরে ইজেকশন সিট ও প্যারাসুটের সহায়তা নেওয়া। গ্যাগারিন তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সফলভাবেই করেছিলেন।


মস্কো শহরের ৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে মধ্য-এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানের একটি কৃষি-জমিতে গ্যাগারিনের প্যারাসুট এসে নামে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নেরই অংশ ছিল। সেখানকার কৃষকদের সহায়তায় গ্রাউন্ড-স্টেশনে টেলিফোন করে গ্যাগারিন নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেন। দম ছেড়ে বাঁচে বইকনুর গ্রাউন্ডস্টেশনে উপস্থিত সবাই। অবশ্য ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই অনাকাঙ্ক্ষিত তথ্যটি সোভিয়েত ইউনিয়ন জনসাধারণের কাছে গোপন রেখেছিলো।


পরবর্তীতে ভস্টক-১ ক্যাপসুল রাশিয়ার RKK Energiya museum এবং Space Pavilion, VDNKh তে প্রদর্শনী করা হয়েছিলো।


ইউরি গ্যাগারিন পরবর্তীতে সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচির দূত হিসেবে বিশ্বের বহু দেশে ভ্রমণ করেন৷ পেশাগতভাবে তাঁর ভবিষ্যৎ নভোচারীদের প্রশিক্ষণ দেবার কথা ছিল। কিন্তু গ্যাগারিন যুদ্ধবিমানের চালক হিসেবে তাঁর প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু, দুঃখের বিষয়, মহাকাশযাত্রার মাত্র সাত বছরের মাথায়, ১৯৬৮ সালের ২৭শে মার্চ, একটি মহড়া চলাকালীন, মাত্র ৩৪ বছর বয়সে গ্যাগারিন তার একজন সঙ্গী সহ MIG-15 বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান। খারাপ আবহাওয়াকেই দায়ী করা হয়েছিলো এ দুঃখজনক দূর্ঘটনার জন্য।


ইউরি গ্যাগারিন তার সাহসিকতাপূর্ণ অভিযানের জন্য বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকত্ব সহ বহু বহু সম্মাননা পেয়েছেন, তার মহাকাশ ভ্রমনের দিনটি (১২এপ্রিল) আন্তর্জাতিক মনুষ্য মহাকাশ যাত্রা দিবস হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয়। ভস্টক-১ তার একমাত্র মহাকাশযাত্রা হলেও, তিনি সুয়োজ-১ মিশনে প্রধান ব্যাক-আপ হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ভস্টক-১ এ তার যাত্রার সফলতার পর সোভিয়েত সরকার- পূর্ব জার্মানি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড ইত্যাদি সমাজতান্ত্রিক বন্ধুদেশগুলির নভোচারীদের মহাকাশযাত্রার সুযোগ করে দেয়।


গ্যাগারিন এর সাহসিকতার জন্য পাওয়া সম্মাননা ও অর্জন সম্পর্কে বর্ণনা করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে একথা বলতেই হয়, ভস্টক-১ এর সাথে জড়িত সকল মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসে একটা বিপ্লবের সূচনা করেছিলো, উন্মোচন করেছিলো এক নবদিগন্তের!

0/আপনার মতামত জানান/Comments